আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও একই দণ্ড দেওয়া হয়, আর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সোমবার রায় ঘোষণা করেন, যা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড আন্দোলন দমন, শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিয়েছে। ঘোষিত রায়ে উল্লেখ করা হয়, বিচারের মুখোমুখি হয়েও শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অনুশোচনা পরিলক্ষিত হয়নি। বরং তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দলীয় নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপে বিদ্বেষপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে গেছেন, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, পূর্ববর্তী আদেশে শেখ হাসিনাকে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও তিনি তা মানেননি। দলীয় নেতা শাকিলের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ২২৬টি মামলা হয়েছে বলেই ২২৬ জনকে হত্যার ‘লাইসেন্স’ তিনি পেয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের মতে, এটি ছিল হত্যার সরাসরি উসকানি।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে গত বছরের ১৪ জুলাইয়ের ফোনালাপও রায়ে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন— “রাজাকারদের ফাঁসি দিয়েছি, এবার তোদেরও তাই করব, একটাও ছাড়ব না।” ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের বক্তব্য স্পষ্টভাবে সহিংসতার নির্দেশ এবং আন্দোলনকারীদের দমন–নিপীড়নের বার্তা দেয়।
রায়ে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দেন এবং তাদের দমনে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারেরও অনুমোদন দেন। সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল–মামুনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল জানায়, শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘কোর কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। প্রতিদিন রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক হতো এবং সেখানেই আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা নেয়া হতো।
ঘোষিত রায়ে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের দাবি শোনা ও রাজনৈতিক আলোচনার বদলে শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং ‘রাজাকার’ শব্দ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের অবমাননা করেছেন। এর পরপরই দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে এবং প্রধানমন্ত্রীকে মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে বলে।
প্রধান প্রসিকিউটর যুক্তিতর্কের সময় বলেন, এত বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং তিনি সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া, তাদের বাড়িঘর ভাঙার হুমকির মতো বক্তব্য দিতে থাকেন। রায়ে ট্রাইব্যুনালও বলেন— তাঁকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও তিনি তা মানেননি।
ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক আইজিপি পরস্পরের যোগসাজশে শিক্ষার্থী–নির্যাতনের পরিকল্পনা করেন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় প্রমাণিত হয়।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো প্রকাশ না হলেও ট্রাইব্যুনালের মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ প্রতিবেদক 








