Hi

০৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে শীত হারানোর শঙ্কা, বাড়বে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:২৯:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৫৯ জন দেখেছে

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সরকারের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই দেশে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে, বাড়বে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের মাত্রা এবং বর্ষায় নামবে আরও বেশি বৃষ্টি। এমনকি ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বাস্তবায়িত হলে ২১০০ সালের মধ্যে দেশের শীত ঋতুই বিলীন হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়াকে বাস্তবসম্মত এবং সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিকে সম্ভাব্য চরম অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ জানান, বিশ্লেষণে দেখা গেছে—আগামী দশকগুলোতে বর্ষার আগে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দেবে। বিশেষ করে ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তিন মাসে প্রায় ২০ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শতাব্দীর শেষে এই সংখ্যা বেড়ে একই সময়ে ৭০ দিনে পৌঁছাতে পারে।

ঢাকাবাসীকেও ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে প্রতিবছর অন্তত দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে—একটি বর্ষার আগে এবং অন্যটি বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে।

শুধু তাপমাত্রাই নয়, বর্ষায়ও দেখা দেবে বড় পরিবর্তন। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর মোট যে বৃষ্টি হয়, তার ৭১ শতাংশ ঝরে জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। আগামীতে এই বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে। ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ১১৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির চাপ পড়বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়।

অন্যদিকে, শীতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা—২১০০ সালের মধ্যে শীতের অস্তিত্বই ফুরিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চল থেকে। তখন উত্তর ও উত্তর-পূর্ব জেলাগুলোয় ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে মাত্র এক বা দুই দিন শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়বে উপকূলীয় অঞ্চলেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বিশেষ হারে বাড়লেও বাংলাদেশের উপকূলে তা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। গড়ে প্রতি বছর বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়তে পারে ২ দশমিক ১ মিলিমিটার, কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

এর ফলে উপকূলীয় ভূমির ১৮ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বাস্তবায়িত হলে ২১০০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ৯১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা (২৩ শতাংশ) পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিভাগের প্রধান হ্যানস ওলাভ বলেন, “এটাই আমাদের সামনে আসন্ন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা সকলকেই মোকাবিলা করতে হবে।”

উল্লেখ্য, জলবায়ুর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ২০১১ সাল থেকে যৌথভাবে গবেষণা করছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট। এবারের প্রতিবেদনটিই তাদের তৃতীয় যৌথ গবেষণা প্রকাশনা।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে শীত হারানোর শঙ্কা, বাড়বে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ

আপডেট সময় : ০২:২৯:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সরকারের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই দেশে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে, বাড়বে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের মাত্রা এবং বর্ষায় নামবে আরও বেশি বৃষ্টি। এমনকি ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বাস্তবায়িত হলে ২১০০ সালের মধ্যে দেশের শীত ঋতুই বিলীন হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়াকে বাস্তবসম্মত এবং সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিকে সম্ভাব্য চরম অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ জানান, বিশ্লেষণে দেখা গেছে—আগামী দশকগুলোতে বর্ষার আগে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দেবে। বিশেষ করে ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তিন মাসে প্রায় ২০ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শতাব্দীর শেষে এই সংখ্যা বেড়ে একই সময়ে ৭০ দিনে পৌঁছাতে পারে।

ঢাকাবাসীকেও ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে প্রতিবছর অন্তত দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে—একটি বর্ষার আগে এবং অন্যটি বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে।

শুধু তাপমাত্রাই নয়, বর্ষায়ও দেখা দেবে বড় পরিবর্তন। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর মোট যে বৃষ্টি হয়, তার ৭১ শতাংশ ঝরে জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। আগামীতে এই বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে। ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ১১৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির চাপ পড়বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়।

অন্যদিকে, শীতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা—২১০০ সালের মধ্যে শীতের অস্তিত্বই ফুরিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চল থেকে। তখন উত্তর ও উত্তর-পূর্ব জেলাগুলোয় ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে মাত্র এক বা দুই দিন শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়বে উপকূলীয় অঞ্চলেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বিশেষ হারে বাড়লেও বাংলাদেশের উপকূলে তা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। গড়ে প্রতি বছর বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়তে পারে ২ দশমিক ১ মিলিমিটার, কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

এর ফলে উপকূলীয় ভূমির ১৮ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বাস্তবায়িত হলে ২১০০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ৯১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা (২৩ শতাংশ) পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিভাগের প্রধান হ্যানস ওলাভ বলেন, “এটাই আমাদের সামনে আসন্ন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা সকলকেই মোকাবিলা করতে হবে।”

উল্লেখ্য, জলবায়ুর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ২০১১ সাল থেকে যৌথভাবে গবেষণা করছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট। এবারের প্রতিবেদনটিই তাদের তৃতীয় যৌথ গবেষণা প্রকাশনা।