জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫-এর খসড়াকে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো পলাতক আসামি প্রার্থী হতে পারবেন না। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে একটি নির্বাচনী এলাকায় পুরো আসনের ভোট বাতিল করার ক্ষমতা পাবে।
নতুন বিধানে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংক্রান্ত সব ধারা বাতিল করা হয়েছে। ‘না ভোট’ পুনর্বহাল করা হয়েছে, যাতে একক প্রার্থী থাকলে ভোটাররা ভোট না দেওয়ার সুযোগ পান। প্রার্থীদের হলফনামায় দেশী ও বিদেশী সম্পদ এবং আয়ের উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, আরপিওর পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর সংক্রান্ত অধ্যাদেশও অনুমোদিত হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থীদের দেশী ও বিদেশী উৎস থেকে আয় ও সম্পত্তির বিবরণ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনগণ সহজে প্রার্থীদের আর্থিক অবস্থা জানতে পারেন।
‘না ভোট’ প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, “যে আসনে একজন প্রার্থী থাকবে, সেখানে ভোটাররা চাইলে ‘না ভোট’ দিতে পারবেন। এতে ২০১৪ সালের মতো বিনা ভোটে নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।”
নতুন বিধানে বলা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটার ও নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন। ভোট গণনার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হবে।
রাজনৈতিক অনুদানের ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হয়েছে, ৫০ হাজার টাকার বেশি চাঁদা বা অনুদান ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দিতে হবে, এবং দাতাকে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে।
গুরুতর অনিয়ম বা গণ্ডগোল হলে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি কেন্দ্র নয়, বরং পুরো নির্বাচনী এলাকার ভোট বাতিল করার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
বৈঠকে উচ্চ আদালতের জামিন কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। আসিফ নজরুল বলেন, “কয়েক ঘণ্টায় শত শত মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছে—এটা বিচারিকভাবে কতটা যৌক্তিক, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।”
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ সম্পর্কে তিনি জানান, আইনটি কার্যকর হলে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও বাজেট ব্যবস্থাপনা সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নীতিগতভাবে অনুমোদনের বিষয়টি জানিয়ে তিনি বলেন, “গণভবনে স্থাপন করা হবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য একটি জাদুঘর, যাতে দেশের তরুণ প্রজন্ম সেই ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে।”
দুদক অধ্যাদেশ বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, “বাংলাদেশে অবস্থানরত কেউ অন্য দেশে দুর্নীতি করলে তার তদন্তও দুদক করতে পারবে। দুদকের কার্যাবলি ও ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং চেয়ারম্যান নির্বাচনে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দুদকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে, কারণ দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ওপরও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।”
জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ প্রতিবেদক 










