Hi

০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালে আমড়ার উৎসব, পেয়ারার চাষের বিকল্প

  • মো. লিমন
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৭:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
  • ৯৩ জন দেখেছে

পেয়ারার মৌসুম শেষ হতে না হতেই ঝালকাঠি সদর, পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার নদী-খালজুড়ে শুরু হয়েছে ‘আমড়ার উৎসব’। এই তিন উপজেলায় দেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারাবাগান থাকলেও, বর্তমান সময়ে চাষিরা বিকল্প হিসেবে জিআই স্বীকৃত আমড়া বাগান চাষে মন দিয়েছেন।

শরতে পরিপক্ব হওয়া আমড়া হেমন্তে সবুজ থেকে হালকা তামাটে রঙ ধারণ করেছে। চাষিরা কোষা নৌকায় আমড়া তুলে পাইকারি হাটে নিয়ে আসছেন। দক্ষিণাঞ্চলের নদী-খালজুড়ে এখন আমড়া তোলা, বাছাই, পরিবহন ও দরদামের ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পেয়ারার চাষে আর লাভজনকতা না থাকায় কৃষকরা প্রায় দশ বছর ধরে আমড়া চাষকে বাণিজ্যিকভাবে বেছে নিচ্ছেন।

মৌসুমি এই ফল এবার অন্তত ২০ হাজার কৃষকের আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলন কিছুটা কম হলেও দাম ভালো থাকায় তারা সন্তুষ্ট। অনেক চাষি জানিয়েছেন, পেয়ারার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আমড়ার বিক্রির অর্থ সহায়ক হয়েছে।

নদীঘেরা বাগানে আমড়ার সমারোহ চোখে পড়ছে। বরিশাল শহর থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই নদী-খালজুড়ে বিশাল আমড়াবাগান রয়েছে। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত মূলত আমড়ার মৌসুম চলে। এই সময় কৃষকরা সারা বছরের খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন।

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কমবেশি আমড়া চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এসব অঞ্চলে শত শত আমড়াবাগান রয়েছে।

বরিশালের আমড়া সম্প্রতি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশেষ স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা বেড়েছে। বরিশালবাসী অনেকেই আত্মীয়স্বজনের কাছে এই আমড়া পাঠান।

চাষিরা জানিয়েছেন, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বৃষ্টি কম হওয়ায় এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেশি থাকায় আমড়ার ফুল ঝরে গেছে। ফলে ফলন কিছুটা কম। তবে জিআই স্বীকৃতির পর দাম বেড়েছে। এবার প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি বাজারে ঝালকাঠি, নেছারাবাদ ও বানারীপাড়ার নদী-খালজুড়ে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিন ২০০–৩০০ মণ আমড়া ঢাকাসহ বড় শহরে পাঠানো হচ্ছে। চাষিরা জানিয়েছেন, পেয়ারার চাষে আর লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না, তাই বিকল্প হিসেবে আমড়ার চাষে মন দিয়েছেন।

বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিভাগজুড়ে ১ হাজার ৮৪৯ হেক্টর জমিতে ২৪ হাজার টন আমড়া উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। পিরোজপুরে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ১২৪ টন উৎপাদিত হয়েছে। ঝালকাঠিতে ৬০২ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৫৭৮ টন। অন্যান্য জেলায় যথাক্রমে বরিশাল ৩ হাজার ৫১৪ টন, বরগুনা ১ হাজার ৪০৪ টন, ভোলা ৪৮০ টন এবং পটুয়াখালী ৩ হাজার ৯০০ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে পেয়ারার জায়গা দখল করে আমড়া চাষ বাড়ছে। পেয়ারার দ্রুত পেকে যাওয়া ও সংরক্ষণ সীমিত থাকার কারণে চাষিরা আমড়ার ওপর নির্ভর করছেন। আমড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের উন্নয়নে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও সংরক্ষণাগারের প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয় চাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এখানকার বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং আমড়া চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উন্নয়নের মাধ্যমে আরও লাভবান হবেন।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালে আমড়ার উৎসব, পেয়ারার চাষের বিকল্প

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

পেয়ারার মৌসুম শেষ হতে না হতেই ঝালকাঠি সদর, পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার নদী-খালজুড়ে শুরু হয়েছে ‘আমড়ার উৎসব’। এই তিন উপজেলায় দেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারাবাগান থাকলেও, বর্তমান সময়ে চাষিরা বিকল্প হিসেবে জিআই স্বীকৃত আমড়া বাগান চাষে মন দিয়েছেন।

শরতে পরিপক্ব হওয়া আমড়া হেমন্তে সবুজ থেকে হালকা তামাটে রঙ ধারণ করেছে। চাষিরা কোষা নৌকায় আমড়া তুলে পাইকারি হাটে নিয়ে আসছেন। দক্ষিণাঞ্চলের নদী-খালজুড়ে এখন আমড়া তোলা, বাছাই, পরিবহন ও দরদামের ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পেয়ারার চাষে আর লাভজনকতা না থাকায় কৃষকরা প্রায় দশ বছর ধরে আমড়া চাষকে বাণিজ্যিকভাবে বেছে নিচ্ছেন।

মৌসুমি এই ফল এবার অন্তত ২০ হাজার কৃষকের আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলন কিছুটা কম হলেও দাম ভালো থাকায় তারা সন্তুষ্ট। অনেক চাষি জানিয়েছেন, পেয়ারার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আমড়ার বিক্রির অর্থ সহায়ক হয়েছে।

নদীঘেরা বাগানে আমড়ার সমারোহ চোখে পড়ছে। বরিশাল শহর থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই নদী-খালজুড়ে বিশাল আমড়াবাগান রয়েছে। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত মূলত আমড়ার মৌসুম চলে। এই সময় কৃষকরা সারা বছরের খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন।

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কমবেশি আমড়া চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এসব অঞ্চলে শত শত আমড়াবাগান রয়েছে।

বরিশালের আমড়া সম্প্রতি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশেষ স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা বেড়েছে। বরিশালবাসী অনেকেই আত্মীয়স্বজনের কাছে এই আমড়া পাঠান।

চাষিরা জানিয়েছেন, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বৃষ্টি কম হওয়ায় এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেশি থাকায় আমড়ার ফুল ঝরে গেছে। ফলে ফলন কিছুটা কম। তবে জিআই স্বীকৃতির পর দাম বেড়েছে। এবার প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি বাজারে ঝালকাঠি, নেছারাবাদ ও বানারীপাড়ার নদী-খালজুড়ে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিন ২০০–৩০০ মণ আমড়া ঢাকাসহ বড় শহরে পাঠানো হচ্ছে। চাষিরা জানিয়েছেন, পেয়ারার চাষে আর লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না, তাই বিকল্প হিসেবে আমড়ার চাষে মন দিয়েছেন।

বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিভাগজুড়ে ১ হাজার ৮৪৯ হেক্টর জমিতে ২৪ হাজার টন আমড়া উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। পিরোজপুরে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ১২৪ টন উৎপাদিত হয়েছে। ঝালকাঠিতে ৬০২ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৫৭৮ টন। অন্যান্য জেলায় যথাক্রমে বরিশাল ৩ হাজার ৫১৪ টন, বরগুনা ১ হাজার ৪০৪ টন, ভোলা ৪৮০ টন এবং পটুয়াখালী ৩ হাজার ৯০০ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে পেয়ারার জায়গা দখল করে আমড়া চাষ বাড়ছে। পেয়ারার দ্রুত পেকে যাওয়া ও সংরক্ষণ সীমিত থাকার কারণে চাষিরা আমড়ার ওপর নির্ভর করছেন। আমড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের উন্নয়নে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও সংরক্ষণাগারের প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয় চাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এখানকার বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং আমড়া চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উন্নয়নের মাধ্যমে আরও লাভবান হবেন।