Hi

০৩:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

  • মো. লিমন
  • আপডেট সময় : ০৯:২৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ৮৯ জন দেখেছে

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রভাবশালী চরিত্র মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তার ইচ্ছানুসারে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়।

১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ভাসানীর শৈশব কেটেছে দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে। যদিও জন্ম সিরাজগঞ্জে, জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে—যা পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

কৈশোর থেকেই রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত ভাসানী বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯১১ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে এসে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯১৭-১৮ সালে প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনায় তুরস্কের সহায়তায় ভারত স্বাধীন করার লক্ষ্যে যে রেশমী রুমাল আন্দোলন সংঘটিত হয়, তাতে ভাসানীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ঘটনায় তিনি ১৯১৯ সালে কারাবরণ করেন।

পরে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কৃষক-মজুরদের অধিকার আদায়ে ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি আসাম ও পূর্ব বাংলায় সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯২৯ সালে আসামের ভাসান চরে অনুষ্ঠিত কৃষক-প্রজা সম্মেলন তার জনপ্রিয়তাকে নতুন মাত্রা দেয়।

দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক যাত্রায় ভাসানী ১৯৩৬ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং পরে আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি হন। লাইন-প্রথাবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব জনসমর্থন আরও বাড়িয়ে তোলে। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় এবং ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষার পক্ষ নিয়ে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন। পরে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৫৫ সালের পল্টন ময়দানের জনসভায় তিনি স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তার বিখ্যাত ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতপার্থক্যের পর ১৯৫৭ সালে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন। ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়ে ১৯৬৫ সালের নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং পরে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব তাকে গণমানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। ১৯৭০ সালে সন্তোষ ও টোবাটেক সিংসহ বেশ কয়েকটি কৃষক সম্মেলনে তিনি অংশ নেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি সর্বদলীয় ওয়ার কাউন্সিলের উপদেষ্টা ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তার ‘ভুখা মিছিল’ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক নদী অধিকার আন্দোলনেরও প্রতীক হয়ে ওঠেন।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএনপি, স্থানীয় সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আলোচনাসভা, দোয়া এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়েছে।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট সময় : ০৯:২৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রভাবশালী চরিত্র মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তার ইচ্ছানুসারে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়।

১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ভাসানীর শৈশব কেটেছে দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে। যদিও জন্ম সিরাজগঞ্জে, জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে—যা পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

কৈশোর থেকেই রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত ভাসানী বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯১১ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে এসে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯১৭-১৮ সালে প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনায় তুরস্কের সহায়তায় ভারত স্বাধীন করার লক্ষ্যে যে রেশমী রুমাল আন্দোলন সংঘটিত হয়, তাতে ভাসানীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ঘটনায় তিনি ১৯১৯ সালে কারাবরণ করেন।

পরে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কৃষক-মজুরদের অধিকার আদায়ে ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি আসাম ও পূর্ব বাংলায় সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯২৯ সালে আসামের ভাসান চরে অনুষ্ঠিত কৃষক-প্রজা সম্মেলন তার জনপ্রিয়তাকে নতুন মাত্রা দেয়।

দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক যাত্রায় ভাসানী ১৯৩৬ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং পরে আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি হন। লাইন-প্রথাবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব জনসমর্থন আরও বাড়িয়ে তোলে। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় এবং ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষার পক্ষ নিয়ে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন। পরে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৫৫ সালের পল্টন ময়দানের জনসভায় তিনি স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তার বিখ্যাত ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতপার্থক্যের পর ১৯৫৭ সালে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন। ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়ে ১৯৬৫ সালের নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং পরে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব তাকে গণমানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। ১৯৭০ সালে সন্তোষ ও টোবাটেক সিংসহ বেশ কয়েকটি কৃষক সম্মেলনে তিনি অংশ নেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি সর্বদলীয় ওয়ার কাউন্সিলের উপদেষ্টা ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তার ‘ভুখা মিছিল’ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক নদী অধিকার আন্দোলনেরও প্রতীক হয়ে ওঠেন।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএনপি, স্থানীয় সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আলোচনাসভা, দোয়া এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়েছে।