Hi

১১:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কল রেকর্ডে ফাঁস—যেভাবে গুলির নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাসিনা

রক্তাক্ত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যখন তীব্রতম পর্যায়ে, তখন ক্ষমতা ধরে রাখতে মারমুখী হয়ে ওঠে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলন থামাতে যেকোনো মূল্যে শক্তি প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্দোলন দমন এবং সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অডিও প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপন করা হয়েছে—যা মামলার রায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

সোমবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। রায়ে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকেও দণ্ডিত করা হয়েছে।

ফোনালাপই ‘অকাট্য প্রমাণ’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, বিচার চলাকালে উপস্থাপিত কয়েকটি ফোন কল রেকর্ড মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব কল রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ডাটাবেস থেকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠজন—সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামাল, সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনালাপে স্পষ্টভাবে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের’ নির্দেশ দেন।

“দেখামাত্র গুলি”—গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নির্দেশ

১৯ জুলাইয়ের এক ফোনালাপে অজ্ঞাতনামা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে শেখ হাসিনা বলেন—
“র‍্যাব ও ডিজিএফআইকে বলা হয়েছে গুলি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করতে হবে। যেখানে দেখবে, সেখানেই লেথাল উইপন দিয়ে গুলি করবে।”

তিনি আরও নির্দেশ দেন—
“যেখানে গ্যাদারিং দেখবে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করবে। ওপেন নির্দেশ দেওয়া আছে।”

একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, “আপনার নির্দেশনা লাগবে।”
জবাবে হাসিনা বলেন—
“আমার নির্দেশ আছে। যেখানে পাবে সোজা গুলি করবে।”

তাপসকে বলেছিলেন—“যতজন পাওয়া যায় ধরে ফেল”

আরেক কল রেকর্ডে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস জানতে চান—
“আন্দোলনকারীদের পাকড়াও করা যায় না?”
হাসিনা উত্তরে বলেন—
“ওটা বলা আছে। ডিজিএফআই ও সবাইকে বলা হয়েছে—যেখানে যে কয়টাকে পাবা, ধরে ফেল।”

আরেক ফোনালাপে তিনি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে বলেন—
“এখন ওপরে থেকে করাচ্ছি। অলরেডি শুরু হয়ে গেছে।”

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে—প্রমাণ ভয়াবহ, রায় তাই প্রত্যাশিত

রাষ্ট্রপক্ষের মতে, দেশজুড়ে ছাত্রজনতার ওপর হত্যাযজ্ঞের মূল নির্দেশদাতা ছিলেন শেখ হাসিনা। ফোনালাপগুলোতে তার ‘সরাসরি হত্যার নির্দেশ’ দেয়ার বিষয়টি আদালতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

রায়ের পর প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক এই রায়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পলাতক থাকায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

কল রেকর্ডে ফাঁস—যেভাবে গুলির নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাসিনা

আপডেট সময় : ০৮:৫১:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

রক্তাক্ত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যখন তীব্রতম পর্যায়ে, তখন ক্ষমতা ধরে রাখতে মারমুখী হয়ে ওঠে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলন থামাতে যেকোনো মূল্যে শক্তি প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্দোলন দমন এবং সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অডিও প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপন করা হয়েছে—যা মামলার রায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

সোমবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। রায়ে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকেও দণ্ডিত করা হয়েছে।

ফোনালাপই ‘অকাট্য প্রমাণ’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, বিচার চলাকালে উপস্থাপিত কয়েকটি ফোন কল রেকর্ড মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব কল রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ডাটাবেস থেকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠজন—সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামাল, সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনালাপে স্পষ্টভাবে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের’ নির্দেশ দেন।

“দেখামাত্র গুলি”—গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নির্দেশ

১৯ জুলাইয়ের এক ফোনালাপে অজ্ঞাতনামা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে শেখ হাসিনা বলেন—
“র‍্যাব ও ডিজিএফআইকে বলা হয়েছে গুলি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করতে হবে। যেখানে দেখবে, সেখানেই লেথাল উইপন দিয়ে গুলি করবে।”

তিনি আরও নির্দেশ দেন—
“যেখানে গ্যাদারিং দেখবে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করবে। ওপেন নির্দেশ দেওয়া আছে।”

একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, “আপনার নির্দেশনা লাগবে।”
জবাবে হাসিনা বলেন—
“আমার নির্দেশ আছে। যেখানে পাবে সোজা গুলি করবে।”

তাপসকে বলেছিলেন—“যতজন পাওয়া যায় ধরে ফেল”

আরেক কল রেকর্ডে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস জানতে চান—
“আন্দোলনকারীদের পাকড়াও করা যায় না?”
হাসিনা উত্তরে বলেন—
“ওটা বলা আছে। ডিজিএফআই ও সবাইকে বলা হয়েছে—যেখানে যে কয়টাকে পাবা, ধরে ফেল।”

আরেক ফোনালাপে তিনি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে বলেন—
“এখন ওপরে থেকে করাচ্ছি। অলরেডি শুরু হয়ে গেছে।”

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে—প্রমাণ ভয়াবহ, রায় তাই প্রত্যাশিত

রাষ্ট্রপক্ষের মতে, দেশজুড়ে ছাত্রজনতার ওপর হত্যাযজ্ঞের মূল নির্দেশদাতা ছিলেন শেখ হাসিনা। ফোনালাপগুলোতে তার ‘সরাসরি হত্যার নির্দেশ’ দেয়ার বিষয়টি আদালতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

রায়ের পর প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক এই রায়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পলাতক থাকায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে।