Hi

০৯:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার মতো একই পরিণতি হয়েছে যেসব বিশ্বনেতার

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : ১০:১০:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৩০ জন দেখেছে

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুরে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

শেখ হাসিনা ছিলেন ক্ষমতায় থাকা সময়ে জাতীয় রাজনীতি ও প্রশাসনে অত্যন্ত প্রভাবশালী। গত বছরের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার দাবি পূরণে বাধা সৃষ্টি এবং পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করে জনবিক্ষোভ দমন করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে তিনি নির্দেশনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। মামলার রায়ে তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তুলনা:
ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার মতো অপরাধে অন্যান্য বিশ্বনেতারাও একই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন।

১. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক, ২০০৬)
সাদ্দাম হোসেন ইরাকের দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দুজাইল গণহত্যার সময় তিনি বিপ্লববিরোধী আন্দোলন দমন করতে র‌্যাবদল ও নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করেছিলেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আক্রমণের পরে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৬ সালে ইরাকের আদালত তাঁকে দুজাইল গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২. নিকোলে সিউসেস্কু (রোমানিয়া, ১৯৮৯)
নিকোলে সিউসেস্কু রোমানিয়ার একনায়ক ছিলেন। ২৪ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় জনগণের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যার অভিযোগ ছিল। ১৯৮৯ সালে রোমানিয়ায় বিপ্লবের পর সামরিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৩. জুলফিকার আলী ভুট্টো (পাকিস্তান, ১৯৭৯)
জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় এবং সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের শাসনামলে রাওয়ালপিন্ডিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৪. পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান, অনুপস্থিতিতে)
পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা দখল করে পরে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেন। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে ২০১৯ সালে দুবাইয়ে থাকাকালীন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৫. ফ্রান্সিসকো ম্যাকিয়াস এনগুয়েমা (নিরক্ষীয় গিনি, ১৯৭৯)
এনগুয়েমা গিনির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গণহত্যা ও দুর্নীতির দায়ে সামরিক অভ্যুত্থান থেকে উৎখাত করার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার শাসনামলে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত বা নির্বাসিত হয়।

৬. ফেরেঙ্ক সালাসি (হাঙ্গেরি, ১৯৪৬)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাঙ্গেরির ফ্যাসিস্ট সরকার চালিত ছিল। সালাসি যুদ্ধাপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৭. লুই ষোড়শ (ফ্রান্স, ১৭৯৩)
ফরাসি বিপ্লবকালে রাজা লুই ষোড়শের শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক দমন ছিল। বিপ্লবের সময় রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৮. ইংল্যান্ডের প্রথম চার্লস (যুক্তরাজ্য, ১৬৪৯)
রাজদ্রোহের দায়ে ইংল্যান্ডের প্রথম চার্লসকে ইংলিশ গৃহযুদ্ধের পরে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। এটি ছিল সেই সময়ের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

৯. বেনিতো মুসোলিনি (ইতালি, ১৯৪৫)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনিকে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাকে বিচার ছাড়াই গুলি করা হয়েছিল।

১০. আদনান মেন্ডেরেস (তুরস্ক, ১৯৬১)
তুরস্কের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অপরাধের দায়ে ১৯৬১ সালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

১১. হিদেকি তোজো (জাপান, ১৯৪৮)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৯৪৮ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি এখনো চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনার মতো একই পরিণতি হয়েছে যেসব বিশ্বনেতার

আপডেট সময় : ১০:১০:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুরে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

শেখ হাসিনা ছিলেন ক্ষমতায় থাকা সময়ে জাতীয় রাজনীতি ও প্রশাসনে অত্যন্ত প্রভাবশালী। গত বছরের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার দাবি পূরণে বাধা সৃষ্টি এবং পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করে জনবিক্ষোভ দমন করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে তিনি নির্দেশনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। মামলার রায়ে তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তুলনা:
ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার মতো অপরাধে অন্যান্য বিশ্বনেতারাও একই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন।

১. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক, ২০০৬)
সাদ্দাম হোসেন ইরাকের দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দুজাইল গণহত্যার সময় তিনি বিপ্লববিরোধী আন্দোলন দমন করতে র‌্যাবদল ও নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করেছিলেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আক্রমণের পরে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৬ সালে ইরাকের আদালত তাঁকে দুজাইল গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২. নিকোলে সিউসেস্কু (রোমানিয়া, ১৯৮৯)
নিকোলে সিউসেস্কু রোমানিয়ার একনায়ক ছিলেন। ২৪ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় জনগণের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যার অভিযোগ ছিল। ১৯৮৯ সালে রোমানিয়ায় বিপ্লবের পর সামরিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৩. জুলফিকার আলী ভুট্টো (পাকিস্তান, ১৯৭৯)
জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় এবং সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের শাসনামলে রাওয়ালপিন্ডিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৪. পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান, অনুপস্থিতিতে)
পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতা দখল করে পরে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেন। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে ২০১৯ সালে দুবাইয়ে থাকাকালীন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৫. ফ্রান্সিসকো ম্যাকিয়াস এনগুয়েমা (নিরক্ষীয় গিনি, ১৯৭৯)
এনগুয়েমা গিনির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গণহত্যা ও দুর্নীতির দায়ে সামরিক অভ্যুত্থান থেকে উৎখাত করার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার শাসনামলে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত বা নির্বাসিত হয়।

৬. ফেরেঙ্ক সালাসি (হাঙ্গেরি, ১৯৪৬)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাঙ্গেরির ফ্যাসিস্ট সরকার চালিত ছিল। সালাসি যুদ্ধাপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৭. লুই ষোড়শ (ফ্রান্স, ১৭৯৩)
ফরাসি বিপ্লবকালে রাজা লুই ষোড়শের শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক দমন ছিল। বিপ্লবের সময় রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৮. ইংল্যান্ডের প্রথম চার্লস (যুক্তরাজ্য, ১৬৪৯)
রাজদ্রোহের দায়ে ইংল্যান্ডের প্রথম চার্লসকে ইংলিশ গৃহযুদ্ধের পরে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। এটি ছিল সেই সময়ের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

৯. বেনিতো মুসোলিনি (ইতালি, ১৯৪৫)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনিকে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাকে বিচার ছাড়াই গুলি করা হয়েছিল।

১০. আদনান মেন্ডেরেস (তুরস্ক, ১৯৬১)
তুরস্কের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অপরাধের দায়ে ১৯৬১ সালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

১১. হিদেকি তোজো (জাপান, ১৯৪৮)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৯৪৮ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি এখনো চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়।