Hi

০৯:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দশম শ্রেণির আগে অর্ধেক ছাত্রীর বাল্যবিবাহ:পরিবারগুলো কী বলছে?

সাতক্ষীরার দক্ষিণতম উপজেলা শ্যামনগরসহ জেলার সব উপজেলায় বাল্যবিবাহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত করছে। জেলা সদর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরে স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শনে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া মেয়েদের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বাল্যবিবাহের কারণে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

শ্যামনগরের সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে দেখা যায়, নবম শ্রেণির ৩০ জন ছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ২১ জন স্কুলে উপস্থিত, বাকি ৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। শিক্ষকরা জানান, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার ব্যয়বহুলতা এবং পরিবারের উদাসীনতার কারণে মেয়েরা স্কুল ছাড়ছে এবং বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জনের মধ্যে দেড় বছর পরে মাত্র ১৭ জনই দশম শ্রেণিতে পৌঁছেছে; ২০ জন বাল্যবিবাহে পড়েছে।

শ্যামনগর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মিনা হাবিবুর রহমান জানান, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে শ্যামনগরে অন্তত ১৬০ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। উপজেলায় ৮২টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৩৬টি মাদ্রাসায় মোট ১,০১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০০ জন ছাত্রী। এদের মধ্যে অনিয়মিত উপস্থিতি ৭০ শতাংশ, ঝরে পড়া ৩৫ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের শিকার ২০ শতাংশ।

শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬২ শতাংশ বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. আবুল খায়ের জানিয়েছেন, লোকবল ও পর্যবেক্ষণের অভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কার্যকরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। সাত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে চারটি পদ শূন্য রয়েছে।

বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, মেয়েদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা বিষয়ে উদাসীনতা, অভিভাবকদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং কিছু বখাটে ছেলের উৎপাতের কারণে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা নিজে প্রেমের সম্পর্কের কারণে বিয়ে করছে।

জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সাকিবুর রহমান বলেন, জেলাজুড়ে এমন কোনো স্কুল নেই, যেখানে বাল্যবিবাহ হচ্ছে না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনীহা এবং অভিভাবকদের মনোভাব বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বড় বাধা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উপবৃত্তি বৃদ্ধি, মাধ্যমিক স্তরে অবৈতনিক শিক্ষা এবং কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহ রাজনৈতিক বিষয় নয়, তাই সরকারের কাছে তা গুরুত্ব পায় না। বাস্তব তথ্য প্রকাশ ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”


সাতক্ষীরা জেলায় বাল্যবিবাহ শিক্ষার চাকা থমকে দিয়েছে। শহর ও গ্রামে ছাত্রীদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে বাল্যবিবাহের প্রথা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

দশম শ্রেণির আগে অর্ধেক ছাত্রীর বাল্যবিবাহ:পরিবারগুলো কী বলছে?

আপডেট সময় : ১০:০২:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

সাতক্ষীরার দক্ষিণতম উপজেলা শ্যামনগরসহ জেলার সব উপজেলায় বাল্যবিবাহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত করছে। জেলা সদর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরে স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শনে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া মেয়েদের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বাল্যবিবাহের কারণে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

শ্যামনগরের সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে দেখা যায়, নবম শ্রেণির ৩০ জন ছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ২১ জন স্কুলে উপস্থিত, বাকি ৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। শিক্ষকরা জানান, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার ব্যয়বহুলতা এবং পরিবারের উদাসীনতার কারণে মেয়েরা স্কুল ছাড়ছে এবং বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জনের মধ্যে দেড় বছর পরে মাত্র ১৭ জনই দশম শ্রেণিতে পৌঁছেছে; ২০ জন বাল্যবিবাহে পড়েছে।

শ্যামনগর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মিনা হাবিবুর রহমান জানান, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে শ্যামনগরে অন্তত ১৬০ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। উপজেলায় ৮২টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৩৬টি মাদ্রাসায় মোট ১,০১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০০ জন ছাত্রী। এদের মধ্যে অনিয়মিত উপস্থিতি ৭০ শতাংশ, ঝরে পড়া ৩৫ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের শিকার ২০ শতাংশ।

শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬২ শতাংশ বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. আবুল খায়ের জানিয়েছেন, লোকবল ও পর্যবেক্ষণের অভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কার্যকরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। সাত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে চারটি পদ শূন্য রয়েছে।

বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, মেয়েদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা বিষয়ে উদাসীনতা, অভিভাবকদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং কিছু বখাটে ছেলের উৎপাতের কারণে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা নিজে প্রেমের সম্পর্কের কারণে বিয়ে করছে।

জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সাকিবুর রহমান বলেন, জেলাজুড়ে এমন কোনো স্কুল নেই, যেখানে বাল্যবিবাহ হচ্ছে না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনীহা এবং অভিভাবকদের মনোভাব বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বড় বাধা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উপবৃত্তি বৃদ্ধি, মাধ্যমিক স্তরে অবৈতনিক শিক্ষা এবং কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহ রাজনৈতিক বিষয় নয়, তাই সরকারের কাছে তা গুরুত্ব পায় না। বাস্তব তথ্য প্রকাশ ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”


সাতক্ষীরা জেলায় বাল্যবিবাহ শিক্ষার চাকা থমকে দিয়েছে। শহর ও গ্রামে ছাত্রীদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে বাল্যবিবাহের প্রথা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।