Hi

১১:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার ২১ লাখ ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এখনই যাচাইয়ের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

  • মো. লিমন
  • আপডেট সময় : ০৬:২০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৭৭ জন দেখেছে

৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে পুরো দেশ কেঁপে ওঠার পর এটিকে ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী। তিনি বলছেন, ঢাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, তার বাস্তব চিত্র আজকের সামান্য কম্পনই সবাইকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। তাই এখনই রাজধানীর সব ভবন পরীক্ষা করা জরুরি, বিশেষ করে বয়সী বা নির্মাণ ত্রুটিযুক্ত ভবনগুলো দ্রুত মূল্যায়নের আওতায় আনা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আনসারী জানান, এই প্রক্রিয়ায় সরকারের আলাদা করে অর্থ খরচ করার প্রয়োজন হবে না; রাজউকের অধীনে সাধারণ ভবন মালিকদের জানিয়ে চেকিংয়ের ব্যবস্থা করা হলে প্রতিটি ভবন সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব যে ভবনটি বিল্ডিং কোড অনুযায়ী সঠিকভাবে নির্মিত হয়েছে কি না।

শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্পে রাস্তায় নেমে আসে অসংখ্য মানুষ এবং shortly afterward খবর আসতে থাকে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির। ঢাকায় রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে দেয়াল ধসে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়া, দেয়ালে চিড় দেখা দেওয়া এবং পলেস্তরা খসে পড়ার ঘটনাও নজরে আসে। অধ্যাপক আনসারী বলেন, এ ধরনের কম্পনকে ভূমিকম্পবিদ্যায় ফোরশক বলা হয়, অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের আগমনী সংকেতও হতে পারে এটি। ইতিহাস টেনে তিনি জানান, এ অঞ্চলে ১৮৯৭ সালে ৮.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল, সাধারণত দুইশ পঞ্চাশ থেকে তিনশ বছরের ব্যবধানে এমন ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ১৯৩০ সালের পর এই অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি; গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং বড় ঝাঁকুনির আশঙ্কা বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই ঢাকার বিভিন্ন ভবনে যে ক্ষতি হয়েছে তা উদ্বেগজনক। ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে—যার মধ্যে ১৫ লাখ একতলা বা দোতলা, প্রায় ছয় লাখ চার থেকে ছয় তলা এবং আরও বহু দশ থেকে বিশতলা অট্টালিকা আছে। এত বিপুল সংখ্যক ভবনের মধ্যে বহু ভবনই দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে এবং নির্মাণবিধি মানা হয়েছে কি না সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রানা প্লাজা ধসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি বড় ভবন ধসে পড়লে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে এবং আরও বড় ভূমিকম্পে ঢাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের হতাহতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে বিদেশের মতো বাংলাদেশেও ভবনগুলো ঝুঁকির ভিত্তিতে রঙ বা নোটিশের মাধ্যমে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রস্তাব দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানে আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে কোন ভবন নিরাপদ, কোনটি আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনটি বসবাসের অনুপযোগী—তা ভবনের গায়ে প্লাকার্ড বা রঙের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। একই ব্যবস্থা রাজউকের মাধ্যমে চালু করলে যেকোনো নাগরিক নিজ বাড়ি কতটা নিরাপদ তা জানবে এবং যেসব ভবন বিপজ্জনক সেগুলো দ্রুত মেরামত বা খালি করার সুযোগ থাকবে। তাঁর মতে, সরকারের সামনে এখনই এ উদ্যোগ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, কারণ আজকের ভূমিকম্প ঢাকা শহরকে মনে করিয়ে দিয়েছে—সময় থাকতেই প্রস্তুতি নেওয়া না গেলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার ২১ লাখ ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এখনই যাচাইয়ের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

আপডেট সময় : ০৬:২০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫

৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে পুরো দেশ কেঁপে ওঠার পর এটিকে ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী। তিনি বলছেন, ঢাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, তার বাস্তব চিত্র আজকের সামান্য কম্পনই সবাইকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। তাই এখনই রাজধানীর সব ভবন পরীক্ষা করা জরুরি, বিশেষ করে বয়সী বা নির্মাণ ত্রুটিযুক্ত ভবনগুলো দ্রুত মূল্যায়নের আওতায় আনা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আনসারী জানান, এই প্রক্রিয়ায় সরকারের আলাদা করে অর্থ খরচ করার প্রয়োজন হবে না; রাজউকের অধীনে সাধারণ ভবন মালিকদের জানিয়ে চেকিংয়ের ব্যবস্থা করা হলে প্রতিটি ভবন সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব যে ভবনটি বিল্ডিং কোড অনুযায়ী সঠিকভাবে নির্মিত হয়েছে কি না।

শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্পে রাস্তায় নেমে আসে অসংখ্য মানুষ এবং shortly afterward খবর আসতে থাকে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির। ঢাকায় রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে দেয়াল ধসে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়া, দেয়ালে চিড় দেখা দেওয়া এবং পলেস্তরা খসে পড়ার ঘটনাও নজরে আসে। অধ্যাপক আনসারী বলেন, এ ধরনের কম্পনকে ভূমিকম্পবিদ্যায় ফোরশক বলা হয়, অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের আগমনী সংকেতও হতে পারে এটি। ইতিহাস টেনে তিনি জানান, এ অঞ্চলে ১৮৯৭ সালে ৮.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল, সাধারণত দুইশ পঞ্চাশ থেকে তিনশ বছরের ব্যবধানে এমন ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ১৯৩০ সালের পর এই অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি; গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং বড় ঝাঁকুনির আশঙ্কা বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই ঢাকার বিভিন্ন ভবনে যে ক্ষতি হয়েছে তা উদ্বেগজনক। ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে—যার মধ্যে ১৫ লাখ একতলা বা দোতলা, প্রায় ছয় লাখ চার থেকে ছয় তলা এবং আরও বহু দশ থেকে বিশতলা অট্টালিকা আছে। এত বিপুল সংখ্যক ভবনের মধ্যে বহু ভবনই দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে এবং নির্মাণবিধি মানা হয়েছে কি না সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রানা প্লাজা ধসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি বড় ভবন ধসে পড়লে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে এবং আরও বড় ভূমিকম্পে ঢাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের হতাহতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে বিদেশের মতো বাংলাদেশেও ভবনগুলো ঝুঁকির ভিত্তিতে রঙ বা নোটিশের মাধ্যমে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রস্তাব দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানে আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে কোন ভবন নিরাপদ, কোনটি আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনটি বসবাসের অনুপযোগী—তা ভবনের গায়ে প্লাকার্ড বা রঙের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। একই ব্যবস্থা রাজউকের মাধ্যমে চালু করলে যেকোনো নাগরিক নিজ বাড়ি কতটা নিরাপদ তা জানবে এবং যেসব ভবন বিপজ্জনক সেগুলো দ্রুত মেরামত বা খালি করার সুযোগ থাকবে। তাঁর মতে, সরকারের সামনে এখনই এ উদ্যোগ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, কারণ আজকের ভূমিকম্প ঢাকা শহরকে মনে করিয়ে দিয়েছে—সময় থাকতেই প্রস্তুতি নেওয়া না গেলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।