ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল ও নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যাংক-কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত একান্ত অপরিহার্য সরকারি বা প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট বিশেষ কাজ ছাড়া কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বিদেশে যেতে পারবেন না বলে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) এ সংক্রান্ত সার্কুলার প্রকাশ করে। নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, নির্বাচনের সময় ব্যাংকিং খাতে কোনো ধরনের শূন্যতা, প্রশাসনিক ব্যাঘাত বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব সৃষ্টি যেন না হয়—সে লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কারণ নির্বাচনী সময়ে দেশে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত সতর্কতা ও দ্রুত সেবাদানের চাপের মধ্যে পড়তে হয়। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য প্রবাহ, লেনদেন নিরাপত্তা, এটিএম সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং ও বৈদেশিক লেনদেনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালাতে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, দায়িত্বশীল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশে অবস্থান ব্যাংক পরিচালনায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন পুরো সময়টিকে ‘সংবেদনশীল সময়’ বিবেচনায় নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংক-কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ আপাতত স্থগিত থাকবে। তবে চিকিৎসা, বাধ্যতামূলক সরকারি দায়িত্ব বা আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তিভিত্তিক জরুরি বৈঠকে অংশগ্রহণের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যক্তিগত বা সরকারি ভ্রমণ করা যাবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ব্যাংকিং কার্যক্রম যাতে বিঘ্নিত না হয়, বিশেষত ব্যস্ততম নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা, আঞ্চলিক অফিস ও সদর দপ্তরে যেন কোনো পদ শূন্য না থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি যেসব কর্মকর্তা ছুটিতে আছেন, তাদের ছুটির বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে যাতে প্রয়োজন হলে জরুরি ভিত্তিতে জনবলকে দায়িত্বে ফেরানো যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে ব্যাংকিং খাতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে বিশেষ মনিটরিং সেলও সক্রিয় রাখা হবে বলে জানা গেছে। প্রয়োজন হলে পৃথক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপসহ অতিরিক্ত নির্দেশনাও দেওয়া হতে পারে।
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তি, ডলার বাজারের ওঠানামা এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনে বাড়তি সতর্কতার সময় পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের কোনো বড় কর্মকর্তা বিদেশে থাকলে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোরতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নির্বাচনের আগে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিতকরণের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ‘সতর্কতামূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ব্যাংকের সার্বিক স্বচ্ছতা, সুশাসন, গ্রাহকসেবা এবং আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মোঃ বেলাল হোসেন সুজন 








