Hi

০১:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জনপ্রশাসনে ভাগ–বাঁটোয়ারা: উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ চায় এনসিপি

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে

জনপ্রশাসনে বদলি–পদায়নে ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ চলছে—এমন অভিযোগ তুলে সেই ভাগ–বাঁটোয়ারায় উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেই সহায়তা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে এই দাবি জানায় এনসিপি প্রতিনিধি দল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম

তিনি বলেন, “জনপ্রশাসনে যেভাবে বদলি–পদায়ন হচ্ছে, সেটা কতটা নিরপেক্ষ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে জানতে পেরেছি, বড় বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে প্রশাসন, এসপি-ডিসিদের ভাগ–বাঁটোয়ারা করছে। সেই তালিকা সরকারকে দেওয়া হচ্ছে এবং উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেও কেউ কেউ এতে সহায়তা করছেন।”

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “এভাবে প্রশাসনিক নিয়োগে দলীয় প্রভাব চলতে থাকলে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছি, যাতে তিনি এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। বিশেষ করে যেসব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, অদক্ষতা বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে—তাদের বিষয়ে যেন তিনি সিদ্ধান্ত নেন।”

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ


🔹 তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে মন্তব্য

বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি জুলাই সনদের আওতায় পড়েছে। সে বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে—গণভোটের পরেই সেটি কার্যকর হতে পারে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব নয়। ফলে এখন কেউ যদি এ দাবি তোলে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের পুরোপুরি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে যেসব উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাঁদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, “ছাত্র উপদেষ্টাদের বিষয়েও অনেক বিতর্ক হচ্ছে, কিন্তু তাঁরা কোনো দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন। যদি ছাত্র উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বলা হয়, তবে অন্য অনেক উপদেষ্টার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ প্রযোজ্য হবে।”


🔹 নির্বাচন কমিশন নিয়ে উদ্বেগ

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের বর্তমান আচরণ ও গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানায় এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কিছু দলের প্রতি পক্ষপাত এবং অন্য দলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। কমিশনের বর্তমান আচরণে সরকারের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। তাই আমরা কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছি।”


🔹 জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক আদেশ নিয়ে আলোচনা

বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থার পর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ নিয়েও আলোচনা হয়। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি, জুলাই সনদের কাগজে লেখা কথায় আমরা বিশ্বাস করি না, এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক আদেশ প্রয়োজন—যেটি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমেই জারি করা সম্ভব। প্রেসিডেন্টের হাতে এ দায়িত্ব নেই।”

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছিল, এবং তার একমাত্র বৈধতা অধ্যাপক ইউনূসের কাছেই রয়েছে।”


🔹 নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ দাবি

এনসিপির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, বিসিএস নন–ক্যাডার বিধিমালা, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা রক্ষার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা দলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।

বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।


🟢 বিশ্লেষণ:
এই বৈঠকের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও উপদেষ্টা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এনসিপির মতো ছোট দলগুলোর এমন সরব অবস্থানও ইঙ্গিত দিচ্ছে—নির্বাচনপূর্ব সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হতে পারে।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

জনপ্রশাসনে ভাগ–বাঁটোয়ারা: উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ চায় এনসিপি

আপডেট সময় : ০৯:০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে

জনপ্রশাসনে বদলি–পদায়নে ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ চলছে—এমন অভিযোগ তুলে সেই ভাগ–বাঁটোয়ারায় উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেই সহায়তা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে এই দাবি জানায় এনসিপি প্রতিনিধি দল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম

তিনি বলেন, “জনপ্রশাসনে যেভাবে বদলি–পদায়ন হচ্ছে, সেটা কতটা নিরপেক্ষ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে জানতে পেরেছি, বড় বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে প্রশাসন, এসপি-ডিসিদের ভাগ–বাঁটোয়ারা করছে। সেই তালিকা সরকারকে দেওয়া হচ্ছে এবং উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেও কেউ কেউ এতে সহায়তা করছেন।”

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “এভাবে প্রশাসনিক নিয়োগে দলীয় প্রভাব চলতে থাকলে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছি, যাতে তিনি এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। বিশেষ করে যেসব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, অদক্ষতা বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে—তাদের বিষয়ে যেন তিনি সিদ্ধান্ত নেন।”

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ


🔹 তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে মন্তব্য

বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি জুলাই সনদের আওতায় পড়েছে। সে বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে—গণভোটের পরেই সেটি কার্যকর হতে পারে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব নয়। ফলে এখন কেউ যদি এ দাবি তোলে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের পুরোপুরি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে যেসব উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাঁদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, “ছাত্র উপদেষ্টাদের বিষয়েও অনেক বিতর্ক হচ্ছে, কিন্তু তাঁরা কোনো দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন। যদি ছাত্র উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বলা হয়, তবে অন্য অনেক উপদেষ্টার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ প্রযোজ্য হবে।”


🔹 নির্বাচন কমিশন নিয়ে উদ্বেগ

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের বর্তমান আচরণ ও গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানায় এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কিছু দলের প্রতি পক্ষপাত এবং অন্য দলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। কমিশনের বর্তমান আচরণে সরকারের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। তাই আমরা কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছি।”


🔹 জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক আদেশ নিয়ে আলোচনা

বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থার পর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ নিয়েও আলোচনা হয়। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি, জুলাই সনদের কাগজে লেখা কথায় আমরা বিশ্বাস করি না, এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক আদেশ প্রয়োজন—যেটি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমেই জারি করা সম্ভব। প্রেসিডেন্টের হাতে এ দায়িত্ব নেই।”

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছিল, এবং তার একমাত্র বৈধতা অধ্যাপক ইউনূসের কাছেই রয়েছে।”


🔹 নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ দাবি

এনসিপির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, বিসিএস নন–ক্যাডার বিধিমালা, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা রক্ষার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা দলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।

বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।


🟢 বিশ্লেষণ:
এই বৈঠকের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও উপদেষ্টা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এনসিপির মতো ছোট দলগুলোর এমন সরব অবস্থানও ইঙ্গিত দিচ্ছে—নির্বাচনপূর্ব সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হতে পারে।