বন্ধুকে পাশে নিয়ে গোপন অভিযানেই যেন বেরিয়ে পড়েছিলাম। ঢাকার ব্যস্ততা ছাড়িয়ে রাতেই উঠে পড়লাম কুয়াকাটাগামী বাসে। ভোরের আলো ফুটতেই নেমে পড়লাম কুয়াকাটার আগের ছোট্ট জনপদ আলীপুর বাজারে। সৌভাগ্য যে এক ভ্রমণপ্রেমী বন্ধুই আগে থেকেই হোটেলের রুম বুক করে রেখেছিলেন—তাই পৌঁছেই কোনো ঝামেলা পোহাতে হলো না। ব্যাগ রেখে তরতাজা শরীরেই ছুটে গেলাম আলীপুরের বিখ্যাত মাছের আড়ত দেখতে। রিকশা ভ্যানে চেপে মুহূর্তেই পৌঁছে গেলাম কোলাহলে ভরা সেই অদ্ভুত এক দুনিয়ায়।
ঘাটজুড়ে সারি সারি নোঙর করা সাগরফেরত ট্রলার। প্রতিটি ট্রলারেই চেনা-অচেনা নানা রকম মাছের সমারোহ। দেখতেই ইচ্ছে হলো কিছু কিনে ফেলি। শেষ পর্যন্ত টাটকা চিংড়ি আর বেল ঘাগড়া কিনে দিলাম ভ্যানচালকের হাতে, তিনি গিয়ে রান্না করে আনবেন। হোটেলে ফিরে গা-গোসল সারতেই দুপুরের খাবার এসে হাজির—দেশি চালের ভাত, ডাল, ভর্তা আর মাছের ঝোল। দীর্ঘ ভ্রমণের শুরুতেই এমন খাওয়া—মনে গেঁথে থাকার মতোই।
খাওয়া দাওয়া শেষে রওনা হলাম তাহেরপুরের পথে। পথে দাঁড়ালাম আমখোলা পাড়ায়। রাস্তার ধারেই প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো মিষ্টি পানির সেই পুকুর—যেখানে একদিন মগ জনগোষ্ঠী সুপেয় পানি সংগ্রহ করত। ছায়াঘেরা সেই পুকুরের সৌন্দর্যে বসে থাকতে ইচ্ছে হলেও আমাদের পথ তখনো অনেক বাকি।
রিকশা ভ্যান এগোতেই সাবমেরিন অফিস পার হয়ে পথের দুই ধারে শুরু হলো সুউচ্চ তালগাছ আর বাবলাগাছের অপরূপ সারি। পথ যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে নিয়ে চলছিল প্রকৃতির গভীরে। এরপর পা রাখলাম লেবুর বনে। যদিও লেবুগাছের অস্তিত্ব তেমন নেই, তবুও কেওড়া, গেওয়া, গরান, কড়ই আর গোলপাতাসহ নানা গাছের জগৎ যেন ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যায়। সৈকতের ধারের কিছু মৃত গাছের অদ্ভুত আকৃতি দেখে মনে হলো— যেন প্রাগৈতিহাসিক কোনো দৃশ্যচিত্রের ভেতর হাঁটছি।
সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়তেই শান্ত সাগরের বালিয়াড়িতে ভ্যান চলল আন্ধারমানিকের দিকে। সেখানকার মসজিদে মাগরিব নামাজ আদায় করে চলে এলাম তাজা কাঁকড়া আর নানা সামুদ্রিক মাছ ভাজা খেতে। গরম তেলের মচমচে কাঁকড়া হাতে এলেই বোঝা যায় ভ্রমণের আনন্দ কাকে বলে!
রাত নেমে গেলে ফিরে এলাম আলীপুরে। খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে গেলাম, কারণ ভোরে আমাদের লক্ষ্য—কাউয়ার চরে সূর্যোদয়।
ভোর সাড়ে তিনটার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভাঙল। প্রস্তুতি সেরে ছুটলাম লক্ষ্মীর বাজার গ্রামের সুন্দর উঠানওয়ালা মসজিদে ফজরের নামাজে। উদ্দেশ্য, দ্রুত গঙ্গামতির চর পেরিয়ে সূর্য ওঠা দেখা। কিন্তু প্রকৃতি সব সময় পরিকল্পনা মানে না—পূর্ব আকাশে একরাশ মেঘ জমে সূর্যোদয় দেখা ভেস্তে গেল। হতাশ না হয়ে ডাবের পানি খেয়ে মোটরসাইকেলে আবার রওনা দিলাম।

সৈকত ধরে ডানে উত্তাল সাগর আর বাঁয়ে ঝাউবন—মোটরবাইক থামিয়েই ফেলতে হয় বারবার। কাউয়ার চরে পৌঁছেই চোখে পড়ল বিলুপ্তির পথে যাওয়া সাগরলতা আর লাল কাঁকড়ার গর্ত। পায়রা নদীর মোহনায় খেয়া জাল ফেলে মাছ ধরা দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ঝাউবনের গভীরে। সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সেই ঝাউবনের সৌন্দর্য—লিখে বোঝানো সত্যিই কঠিন।
এরপর গেলাম বটতলীর হামিদ সি প্যালেসে। যাওয়ার আগে সাগরফেরত তাজা ইলিশে বানানো খিচুড়ি খেয়ে নিলাম। এত কম দাম দেখে ঢাকাবাসী না হলে দীর্ঘশ্বাস না ফেলে উপায় ছিল না! নিজ হাতে ইলিশ ভেজে খাওয়া—ভ্রমণে বাড়তি সুখ এনে দেয়।

হামিদ প্যালেসে পৌঁছেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া আকাশমণি গাছ। ভেতরে আছে দোতলা বাংলো, যার ছাদে দাঁড়ালেই পুরো ঝাউবন আর তালবাগানের সৌন্দর্য দেখা যায়। প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে বিস্তৃত তালগাছ, মাছের খামার, দেশি গরুর পাল আর স্বর্ণ-৫ ধানের বাগান—সব মিলিয়ে যেন এক প্রাকৃতিক রাজ্য।
ফিরতে ফিরতে মনে হলো—কাউয়ার চরে আসা সত্যিই সার্থক।
যাবেন যেভাবে
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে কুয়াকাটা যেতে পারবেন। কুয়াকাটা থেকে মোটরবাইক, অটো বা ভ্যানে কাউয়ার চর যাওয়া যায়। চাইলে একদিনেই ঘুরে ফেরা সম্ভব।
থাকা-খাওয়া
কুয়াকাটায় অসংখ্য হোটেল-মোটেল আছে। কাউয়ার চরে থাকতে চাইলে তাঁবু বা স্থানীয়দের সহযোগিতা নিতে পারেন। গঙ্গামতি মাত্র এক কিলোমিটার দূরে, সেখানেও থাকা যায়।
মো. লিমন 








