Hi

১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে জালিয়াতি: পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিল চক্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অনলাইন সিস্টেমে জালিয়াতির মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অন্যের সঞ্চয়পত্র মেয়াদপূর্তির আগেই ভেঙে তারা টাকা নিজেদের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতায় আরও প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ঘটনাটি ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, যাদের হিসাবে অর্থ গেছে এবং যারা জালিয়াতিতে জড়িত, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র সিস্টেম পরিচালনাকারীদের কারও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই এ জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে।

কীভাবে ঘটলো জালিয়াতি

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট অফিসে উপস্থিত থেকে আবেদন করতে হয়, এবং তার মোবাইলে পাঠানো ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) প্রদান করলেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে কোনও ওটিপি পাঠানো ছাড়াই সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সিস্টেমে প্রবেশ করে তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে জালিয়াতরা এই কাজটি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাদের সঞ্চয়পত্র বা প্রবাসী আয়ের টাকা উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগে কিছু জালিয়াত চক্র ব্যাংক পরিবর্তনের আবেদন দেখিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

২৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার কৌশল

একজন গ্রাহক সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন। তার ব্যাংক হিসাব ছিল অগ্রণী ব্যাংকের জাতীয় প্রেসক্লাব শাখায়। চার দিনের মাথায় সেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে টাকা স্থানান্তর করা হয় এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুর উপশাখার এক অচেনা ব্যক্তির হিসাবে। পরে রাজধানীর শ্যামলী শাখা থেকে ওই টাকা তুলে নেওয়া হয়।

একই দিনে আরও ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র একই কৌশলে ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়—ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ লাখ এবং এনআরবি ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি ধরা পড়ায় লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চিহ্নিত হচ্ছে জড়িতরা

তিনজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে—তারা কেউই সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর আবেদন করেননি, এমনকি কোনও ওটিপিও পাননি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার কাছে সিস্টেমের পাসওয়ার্ড ছিল, তাদের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। পাসওয়ার্ডধারী কর্মকর্তারা বর্তমানে নজরদারিতে রয়েছেন, পাশাপাশি বাইরের কারও সম্পৃক্ততা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটি গঠন

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই ডিএমডির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন শিগগির পাওয়া যাবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের মোট সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং পোস্ট অফিসসহ প্রায় ১২ হাজার শাখায় এসব সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও ভাঙানো হয়।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে জালিয়াতি: পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিল চক্র

আপডেট সময় : ১২:৫০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অনলাইন সিস্টেমে জালিয়াতির মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অন্যের সঞ্চয়পত্র মেয়াদপূর্তির আগেই ভেঙে তারা টাকা নিজেদের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতায় আরও প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ঘটনাটি ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, যাদের হিসাবে অর্থ গেছে এবং যারা জালিয়াতিতে জড়িত, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র সিস্টেম পরিচালনাকারীদের কারও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই এ জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে।

কীভাবে ঘটলো জালিয়াতি

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট অফিসে উপস্থিত থেকে আবেদন করতে হয়, এবং তার মোবাইলে পাঠানো ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) প্রদান করলেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে কোনও ওটিপি পাঠানো ছাড়াই সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সিস্টেমে প্রবেশ করে তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে জালিয়াতরা এই কাজটি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাদের সঞ্চয়পত্র বা প্রবাসী আয়ের টাকা উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগে কিছু জালিয়াত চক্র ব্যাংক পরিবর্তনের আবেদন দেখিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

২৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার কৌশল

একজন গ্রাহক সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন। তার ব্যাংক হিসাব ছিল অগ্রণী ব্যাংকের জাতীয় প্রেসক্লাব শাখায়। চার দিনের মাথায় সেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে টাকা স্থানান্তর করা হয় এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুর উপশাখার এক অচেনা ব্যক্তির হিসাবে। পরে রাজধানীর শ্যামলী শাখা থেকে ওই টাকা তুলে নেওয়া হয়।

একই দিনে আরও ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র একই কৌশলে ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়—ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ লাখ এবং এনআরবি ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি ধরা পড়ায় লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চিহ্নিত হচ্ছে জড়িতরা

তিনজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে—তারা কেউই সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর আবেদন করেননি, এমনকি কোনও ওটিপিও পাননি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার কাছে সিস্টেমের পাসওয়ার্ড ছিল, তাদের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। পাসওয়ার্ডধারী কর্মকর্তারা বর্তমানে নজরদারিতে রয়েছেন, পাশাপাশি বাইরের কারও সম্পৃক্ততা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটি গঠন

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই ডিএমডির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন শিগগির পাওয়া যাবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের মোট সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং পোস্ট অফিসসহ প্রায় ১২ হাজার শাখায় এসব সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও ভাঙানো হয়।