Hi

১২:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য: শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু

  • মো. লিমন
  • আপডেট সময় : ১১:৪৮:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৯৪ জন দেখেছে

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থালা হাতে বিক্ষোভ করে সম্মিলিত নন-এমপিও ঐক্য পরিষদ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় আবারও আন্দোলনে নামছেন। আগামীকাল থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন তারা।

সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলতি মাসের মাঝামাঝি শুরু হচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষা। এমন সময়ে শিক্ষকদের টানা অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের নিয়োগযোগ্যতা স্নাতক করার পরও তাদের বেতন ১৩তম গ্রেডে রাখা হয়েছে। অথচ একই যোগ্যতায় সরকারের অন্যান্য দপ্তরে কর্মচারীরা দশম গ্রেডে নিয়োগ পাচ্ছেন—যা সরাসরি বৈষম্য।
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, “আমাদের দাবি কেবল বেতনের নয়, মর্যাদারও। শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে এই শ্রেণিবৈষম্যের অবসান ঘটবে বলেই আমরা আশাবাদী।”

আন্দোলনে সাড়া দেশের লাখো শিক্ষক

সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৬২০টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় পৌনে চার লাখ শিক্ষক কর্মরত।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম–শাহিন), বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন–লিপি), সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদসহ কয়েকটি সংগঠন। তারা অন্তত এক লাখ শিক্ষককে এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।

শিক্ষকরা জানান, তাদের তিনটি প্রধান দাবি—
১. সহকারী শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করা,
২. চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতির সমস্যা সমাধান,
৩. শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।

গত ৩০ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশ করে এসব দাবি জানানো হয়। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে তারা ঘরে ফিরে যান। তবে দুই মাস পার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় আন্তরিক হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় নানা অজুহাতে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে।”
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, “আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব।”

সরকারের অবস্থান

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সহকারী শিক্ষকদের পদকে ‘শিক্ষক’ পদনাম দিয়ে দশম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অভিযোগ

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা ২০১৪ সাল থেকেই বেতন বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। ২০২০ সালে তাদের ১৪তম থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে নিয়োগযোগ্যতা স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণি নির্ধারণের পর শিক্ষকরা আবারও দশম গ্রেডের দাবি তোলেন।

তাদের অভিযোগ—একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেও পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একই যোগ্যতায় দশম গ্রেডে বেতন পান। একই শিক্ষাক্রম ও সিলেবাসে কাজ করেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

শেরপুর সদরের ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহানুর রহমান রোমান বলেন, “আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। অথচ বেতন তৃতীয় শ্রেণির। এই মর্যাদাহীন অবস্থায় আমরা কীভাবে শিশুদের বড় স্বপ্ন শেখাব?”

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর আইচাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ মতিয়ুর রহমান বলেন, “২০১৮ সালে আমাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু সাত বছরেও পূর্ণাঙ্গ পদোন্নতি পাইনি। এখনও তৃতীয় শ্রেণির বেতন পাই। সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতি ও দশম গ্রেডে উন্নীত করা সরকারের ন্যায্য দায়িত্ব।”

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্যটি সংরক্ষন করুন

যাচাইকারীর নাম

jatioaparadh aparadh

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য: শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু

আপডেট সময় : ১১:৪৮:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় আবারও আন্দোলনে নামছেন। আগামীকাল থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন তারা।

সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলতি মাসের মাঝামাঝি শুরু হচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষা। এমন সময়ে শিক্ষকদের টানা অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের নিয়োগযোগ্যতা স্নাতক করার পরও তাদের বেতন ১৩তম গ্রেডে রাখা হয়েছে। অথচ একই যোগ্যতায় সরকারের অন্যান্য দপ্তরে কর্মচারীরা দশম গ্রেডে নিয়োগ পাচ্ছেন—যা সরাসরি বৈষম্য।
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, “আমাদের দাবি কেবল বেতনের নয়, মর্যাদারও। শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে এই শ্রেণিবৈষম্যের অবসান ঘটবে বলেই আমরা আশাবাদী।”

আন্দোলনে সাড়া দেশের লাখো শিক্ষক

সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৬২০টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় পৌনে চার লাখ শিক্ষক কর্মরত।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম–শাহিন), বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন–লিপি), সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদসহ কয়েকটি সংগঠন। তারা অন্তত এক লাখ শিক্ষককে এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।

শিক্ষকরা জানান, তাদের তিনটি প্রধান দাবি—
১. সহকারী শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করা,
২. চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতির সমস্যা সমাধান,
৩. শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।

গত ৩০ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশ করে এসব দাবি জানানো হয়। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে তারা ঘরে ফিরে যান। তবে দুই মাস পার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় আন্তরিক হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় নানা অজুহাতে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে।”
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, “আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব।”

সরকারের অবস্থান

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সহকারী শিক্ষকদের পদকে ‘শিক্ষক’ পদনাম দিয়ে দশম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অভিযোগ

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা ২০১৪ সাল থেকেই বেতন বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। ২০২০ সালে তাদের ১৪তম থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে নিয়োগযোগ্যতা স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণি নির্ধারণের পর শিক্ষকরা আবারও দশম গ্রেডের দাবি তোলেন।

তাদের অভিযোগ—একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেও পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একই যোগ্যতায় দশম গ্রেডে বেতন পান। একই শিক্ষাক্রম ও সিলেবাসে কাজ করেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

শেরপুর সদরের ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহানুর রহমান রোমান বলেন, “আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। অথচ বেতন তৃতীয় শ্রেণির। এই মর্যাদাহীন অবস্থায় আমরা কীভাবে শিশুদের বড় স্বপ্ন শেখাব?”

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর আইচাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ মতিয়ুর রহমান বলেন, “২০১৮ সালে আমাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু সাত বছরেও পূর্ণাঙ্গ পদোন্নতি পাইনি। এখনও তৃতীয় শ্রেণির বেতন পাই। সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতি ও দশম গ্রেডে উন্নীত করা সরকারের ন্যায্য দায়িত্ব।”