স্ট্রোক হলে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাঁদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রতি চারজনে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মোট স্ট্রোকের ৮৯ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল দেশে। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতি মিনিটে প্রায় ১.৯ মিলিয়ন মস্তিষ্কের স্নায়ু–কোষ নষ্ট হয়ে যায়। তাই চিকিৎসার ক্ষেত্রে “সময়” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই সময়সীমা অতিক্রম করলে জীবনরক্ষার পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যায়।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবসকে ঘিরে রোববার (২ নভেম্বর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক দপ্তরের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় স্ট্রোক নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢামেক হাসপাতালের এন্ডোভাসকুলার ও স্ট্রোক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান শিকদার।
তিনি জানান, স্ট্রোক দুই প্রকার—ইশকেমিক এবং হিমোরেজিক। ইশকেমিক স্ট্রোক, অর্থাৎ রক্তনালী বন্ধ হয়ে যে স্ট্রোক হয়, তার হার ৮৫ শতাংশ; আর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে যে হিমোরেজিক স্ট্রোক হয়, তার হার ১৫ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশে স্ট্রোকের হার বেশি—মোট স্ট্রোকের ৮৯ শতাংশই এই অঞ্চলে ঘটে। তাঁর ভাষায়, “স্ট্রোক হলে প্রতি মিনিটে ১.৯ মিলিয়ন নিউরন মারা যায়। তাই রোগীকে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকের কাছে আনতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব, আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আনা গেলে অন্তত জীবন সুরক্ষা পায়।”
স্ট্রোকের চিকিৎসা আধুনিক পদ্ধতিতে দেশে দক্ষতার সঙ্গে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, স্ট্রোক ইউনিটবিহীন হাসপাতালে শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আরও স্ট্রোক ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
স্ট্রোকের সতর্কসংকেত শনাক্ত করার সহজ পদ্ধতি হিসেবে তিনি ‘বি–ফাস্ট’ (B-FAST) ধারণা তুলে ধরেন।
বি মানে ব্যালান্স—হঠাৎ হাঁটতে বা দাঁড়াতে সমস্যা হওয়া
ই মানে আই—হঠাৎ এক বা দুই চোখে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
এফ মানে ফেস—মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া
এ মানে আর্মস—হাত–পা দুর্বল হয়ে পড়া বা অবশ হওয়া
এস মানে স্পিচ—কথা আটকে যাওয়া বা অস্পষ্ট উচ্চারণ
টি মানে টাইম—সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার গুরুত্ব
তিনি জানান, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে কল করা বা সরাসরি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে গেলে রোগীর সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করে পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। প্রয়োজনে সিটি এনজিওগ্রাম বা ডিজিটাল সাবস্ট্রাকশন এনজিওগ্রাম (ডিএসএ) করা হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।
তিনি আরও বলেন, স্ট্রোক চিকিৎসায় দলগত কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন, নার্স রোগীর শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন, ফিজিওথেরাপিস্ট পুনর্বাসন করেন, এবং ওয়ার্ড সহকারী সময়মতো রোগীকে পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করেন। সামান্য দেরিও রোগীর মস্তিষ্কের লক্ষ লক্ষ নিউরন নষ্ট করে দিতে পারে।
সভায় ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। অনেক রোগী বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা—তাই সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, “স্ট্রোক চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। জেলা ও বিভাগীয় শহরে স্ট্রোক চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম (পিএইচডি)। তিনি বলেন, “প্রতি চার জনে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত—এই হার কমিয়ে প্রতি চল্লিশ জনে একজন করা সম্ভব। সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের পরিবর্তন করলে স্ট্রোকের ৯০ শতাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
অধ্যাপক ডা. ফজলে এলাহী মিলাদ বলেন, অসংক্রামক রোগের ওষুধ বন্ধ করে দিলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, লবণ–চিনি কম খাওয়া, এবং জাঙ্কফুড বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেন। ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, স্ট্রোকের অনেক রোগী—বিশেষ করে বয়স্কদের—অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বক্তারা স্ট্রোক বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স, স্ট্রোক হটলাইন, এবং জেলা–স্তরে স্ট্রোক সেন্টার স্থাপনের দাবিও জানান।
প্রসঙ্গত, চিকিৎসা শিক্ষার বৈশ্বিক স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) কার্যক্রম চলমান থাকায় ২৯ অক্টোবর দিবসটি পালন করা সম্ভব হয়নি। চার দিন পর আজকের আয়োজনে তা প্রতিস্থাপিত হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের ডা. সুজন শরীফ।
জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ প্রতিবেদক 














